মোঃ আলমগীর হোসাইন ক্রাইম রিপোর্টার,কুড়িগ্রাম
মঙ্গলবার, ২৭ মে ২০২৬
কুড়িগ্রামের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ঈদের আনন্দ যেন দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। নদীভাঙন, দারিদ্র্য আর অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে অনেক পরিবারের কাছে কোরবানি এখন শুধুই স্বপ্ন। কোথাও কোরবানির পশু কেনার সামর্থ নেই, আবার অনেক ঘরে ঈদের দিন এক কেজি মাংসও জুটবে না এমন বাস্তবতাই দেখা যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন চরে।
সরেজমিনে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র নদঘেঁষা ‘মাঝের চর’ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে শুধুই সংগ্রামের গল্প। নদীর বুক জেগে ওঠা এই চরে এখনো নেই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। যাত্রাপুর নৌঘাটে পৌঁছাতে নৌকায় সময় লাগে প্রায় এক ঘণ্টা। চার বছর আগে জেগে ওঠা এই চরে নদীভাঙনে সর্বস্ব হারানো অন্তত ৭০টি পরিবার নতুন করে বসতি গড়েছে। কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই মিললেও বদলায়নি তাদের জীবনযুদ্ধ।
চরের বাসিন্দা আরমান আলী ও তার স্ত্রী আউলিয়া বেগম চার সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। জীবিকার তাগিদে আরমান আলী সিরাজগঞ্জে একটি তাঁত কারখানায় কাজ করেন। তবে দীর্ঘদিন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও অনিয়মিত কাজের কারণে এবার ঠিকমতো আয় করতে পারেননি। ফলে সন্তানদের নতুন পোশাক তো দূরের কথা, ঈদের দিন সামান্য মাংস কেনার সামর্থও নেই তার।
আরমান আলী বলেন,
তাঁতের কাজ বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না। এবার কাজ খুব কম হয়েছে। হাতে কোনো টাকা নেই। বাচ্চাদের নতুন জামা কিনতে পারিনি। ঈদের দিন মাংস খাওয়াতে পারবো কিনা তাও জানি না।
একই হতাশার কথা জানান জেসমিন আক্তার। তিনি বলেন,
আমাদের চরে কোরবানি হয় না বললেই চলে। ঈদের দিন বাচ্চাদের একটু মাংস খাওয়াতে পারলে ভালো লাগতো।
চরের আরেক বাসিন্দা রাজু মিয়া বলেন,
এখানকার বেশিরভাগ মানুষই গরিব। কেউ কোরবানি দিতে পারে না। যাদের সামর্থ আছে তারা হয়তো বাজার থেকে অল্প মাংস কিনে খাবে, আর বাকিরা সেটাও পাবে না।
মাঝের চরের অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। ধান, কাউন ও ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসল ফলিয়েই কোনোমতে সংসার চলে। কিন্তু উৎপাদন খরচ মেটানোর পর হাতে খুব সামান্য আয় থাকে। সেই আয় দিয়েই পুরো বছর টিকে থাকার সংগ্রাম করতে হয় তাদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বসতি স্থাপনের পর গত তিন বছরেও এই চরে কেউ গরু কোরবানি দিতে পারেননি। গত বছর একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু মাংস বিতরণ করেছিল। এবারও অনেক পরিবার আশা করছেন কেউ হয়তো সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবেন।
শুধু মাঝের চর নয়, সদর উপজেলার পোড়ার চর, আইড়মারী, অষ্টআশির চর, উলিপুরের মুসারচর, জাহাজের আলগা ও দইখাওয়ার চরসহ জেলার সাড়ে চার শতাধিক চরের অধিকাংশ মানুষের অবস্থাই একই রকম। নদীভাঙন আর দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করেই তাদের জীবন কাটে।
জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ৯ উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় প্রায় ৪৬৯টি চর রয়েছে। এসব চরে বাস করেন পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী।
কুড়িগ্রাম চর উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম বেবু বলেন,
চরের মানুষের কাছে ঈদ এখন আনন্দের চেয়ে টিকে থাকার লড়াই। সামনে বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই অনেক পরিবার ঈদের চেয়ে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় বেশি কষ্টে আছে।
তিনি আরও বলেন,
সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে চরবাসীর পাশে দাঁড়ান, তাহলে অসংখ্য অসহায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটতে পারে।
এ বিষয়ে সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ জানান, ঈদ উপলক্ষে হতদরিদ্র মানুষের জন্য ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রিও চলছে। তবে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা অত্যন্ত কষ্টকর উল্লেখ করে তিনি সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।