মোঃ সুজন মাহমুদ | ক্রাইম রিপোর্টার
নাটোরে স্বাস্থ্য বিভাগের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে অবাধে চলছে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান, অদক্ষ জনবল, মানহীন চিকিৎসাসেবা এবং দুর্বল তদারকির কারণে জেলার স্বাস্থ্যখাত এখন চরম ঝুঁকির মুখে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নানা অনিয়মের মধ্য দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। অথচ অভিযান ও নজরদারির দাবি থাকলেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।1
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নাটোর জেলায় নিবন্ধিত ১৭৮টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে অল্প কয়েকটিরই রয়েছে হালনাগাদ লাইসেন্স। সদর উপজেলায় ৭১টির মধ্যে মাত্র ২৩টি, সিংড়ায় ৮টির মধ্যে ৩টি, গুরুদাসপুরে ২৪টির মধ্যে ৪টি, বড়াইগ্রামে ৩৭টির মধ্যে ৫টি, লালপুরে ২৪টির মধ্যে ৮টি, বাগাতিপাড়ায় ৬টির মধ্যে ৫টি এবং নলডাঙ্গায় ৮টির মধ্যে মাত্র ২টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে।
এ পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে যে, জেলার অধিকাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কার্যত বৈধতার সংকটে পরিচালিত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। অনেক প্রতিষ্ঠানে লাইসেন্স নম্বর পর্যন্ত প্রদর্শন করা হয় না। কোথাও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক, কোথাও নেই প্রশিক্ষিত নার্স বা দক্ষ টেকনিশিয়ান। আবার কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাগজে-কলমে জনবল দেখিয়ে চিকিৎসাসেবা পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রোগীদের জীবন নিয়ে যেন এক ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। সামান্য চিকিৎসার জন্য ভর্তি হওয়া রোগীরা জটিলতার শিকার হচ্ছেন, অথচ দায় এড়াতে ব্যস্ত থাকছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক প্রসূতির সিজার অপারেশনের পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে দ্রুত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। একইভাবে এপ্রিল মাসে নাটোর শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজার অপারেশনের পর জটিলতায় এক নারীর মৃত্যুর অভিযোগ ওঠে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ তুললেও সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে এসব ঘটনার পর স্বাস্থ্যসেবার মান এবং তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) নাটোর শাখার সদস্য সচিব ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “প্রশিক্ষিত জনবল ও মানসম্মত যন্ত্রপাতি ছাড়া চিকিৎসাসেবা পরিচালনা রোগীদের জীবনের জন্য বড় হুমকি।” তবে তিনি জানান, এ বিষয়ে বিএমএর সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই।
অভিযোগের বিষয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিকরা দাবি করেছেন, লাইসেন্স নবায়নের জন্য আবেদন করা হলেও প্রশাসনিক জটিলতা, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং অন্যান্য কাগজপত্রের কারণে অনুমোদন পেতে দেরি হচ্ছে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করলে কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন করা হবে না। একইসঙ্গে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত ও কার্যকর অভিযান না থাকায় অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে পরিচালিত অভিযানে কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সাময়িক পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকে।
ফলে সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি ও প্রশাসনিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কীভাবে বছরের পর বছর অবৈধ ক্লিনিকগুলো নির্বিঘ্নে কার্যক্রম পরিচালনা করছে?
স্বাস্থ্যসেবা এমন একটি খাত, যেখানে সামান্য অবহেলাও কেড়ে নিতে পারে একটি প্রাণ। অথচ নাটোরে লাইসেন্সহীন ও অনিয়মে পরিচালিত অসংখ্য ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এখনও বহাল তবিয়তে ব্যবসা করে যাচ্ছে। কার্যকর তদারকি, নিয়মিত অভিযান এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এ সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।