খুলনা জেলা প্রতিনিধি | এস, কে, রাজু আহম্মেদ।
এক সময় দেশের অন্যতম প্রাণচঞ্চল শিল্পাঞ্চল ছিল খুলনা। দিন-রাত শ্রমিকের কোলাহল, মিলের সাইরেন আর উৎপাদনের ব্যস্ততায় মুখর থাকত খালিশপুর, দৌলতপুর, আটরা, শিরোমনি ও রূপসা শিল্পাঞ্চল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই পরিচয় এখন প্রায় অতীত। একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খুলনাকে এখন অনেকে বলছেন “বন্ধ শিল্পের নগরী”, আবার কারও ভাষায় “মৃত শিল্পনগরী”।
রাষ্ট্রায়ত্ত নয়টি পাটকল, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল, হার্ডবোর্ড মিল, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি, খুলনা টেক্সটাইল মিল, কোরাইশি স্টিল মিল ও খুলনা অক্সিজেন লিমিটেডসহ অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপাশি ব্যক্তি মালিকানাধীন বহু পাটকল, লবণ মিল ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাও ধুঁকছে কিংবা বন্ধ হয়ে পড়েছে। ফলে শিল্পনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে, কমেছে জনসংখ্যাও।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২০ সালের ২ জুলাই, যখন লোকসানের কারণ দেখিয়ে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত সাতটি পাটকল বন্ধ ঘোষণা করে বিজেএমসি। এতে প্রায় ২৬ হাজার স্থায়ী ও অস্থায়ী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েন। তৎকালীন সরকার লিজের মাধ্যমে আধুনিকায়নের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে অধিকাংশ মিল আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। বর্তমানে দৌলতপুর জুট মিল ও ইস্টার্ন জুট মিল সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও আগের কর্মচাঞ্চল্যের ছিটেফোঁটাও নেই।
বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিকদের অনেকেই এখন রিকশা-ভ্যান চালানো, দিনমজুরি কিংবা ছোটখাটো কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। আবার অনেকে দীর্ঘদিন ধরে বেকার। বহু শ্রমিক এখনো কোটি কোটি টাকার পাওনা বুঝে পাননি।
শুধু পাটকল নয়, খুলনার ঐতিহ্যবাহী নিউজপ্রিন্ট মিল ও হার্ডবোর্ড মিলও বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অব্যবহারে নষ্ট হয়ে গেছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। একইভাবে খুলনা টেক্সটাইল মিল, দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরি ও কোরাইশি স্টিল মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হাজার হাজার পরিবার জীবিকা হারিয়েছে।
একসময় লাভজনক হিসেবে পরিচিত খুলনার হিমায়িত চিংড়ি শিল্পও এখন সংকটে। প্রায় ৪০টি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার অধিকাংশই বন্ধ বা অচল অবস্থায় রয়েছে। লবণ শিল্পেও একই চিত্র। ভৈরব ও রূপসা নদীর তীরে গড়ে ওঠা ২৮টি লবণ মিলের মধ্যে ২০টিই বন্ধ হয়ে গেছে।
পদ্মা সেতু চালুর পর নতুন শিল্পায়নের যে স্বপ্ন খুলনাবাসী দেখেছিলেন, বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি। সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো পর্যায় থেকেই বড় ধরনের বিনিয়োগ আসেনি। বিডা সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে খুলনায় মাত্র সাতটি ছোট ও মাঝারি শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে, যেখানে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা। ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু অর্থনীতিতে নয়, সামাজিক জীবনেও পড়েছে। কর্মসংস্থানের অভাবে বাড়ছে হতাশা, দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তা। এক সময় যে খুলনা ছিল দেশের শিল্প অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, সেই খুলনাই আজ হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায়।